অতিবৃষ্টি ও বন্যা

এক লাখ হেক্টরের বেশি কৃষিজমি আক্রান্ত, প্রভাব পড়তে পারে উৎপাদন ও বাজারে

টানা কয়েকদিন ধরে অতিবৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে কৃষি খাতে।

সরকারি প্রাথমিক হিসাবে, এ পর্যন্ত ১ লাখ ৪ হাজার ৯৩৬ হেক্টর কৃষিজমি বন্যা ও জলাবদ্ধতায় আক্রান্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আউশ ধান। পাশাপাশি তলিয়ে গেছে আমনের বীজতলা, সদ্য রোপণ করা চারা ও গ্রীষ্মকালীন সবজিখেত। ভেসে গেছে মাছের ঘের। বিপাকে পড়েছেন পোলট্রি ও গবাদিপশুর খামারিরাও।

কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই সামগ্রিক উৎপাদনে বড় ধরনের ধসের আশঙ্কা না থাকলেও পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে ক্ষতির পরিমাণ দ্রুত বাড়বে। এর প্রভাব কৃষিপণ্য সরবরাহ, বাজার ব্যবস্থা এবং খাদ্যপণ্যের দামেও পড়তে পারে। তাই দ্রুত ক্ষয়ক্ষতির মূল্যায়ন, কৃষকদের পুনর্বাসন, বীজ ও কৃষি উপকরণ সহায়তা এবং ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার উৎপাদন পুনরুদ্ধারে জরুরি উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। তাদের মতে, দুর্যোগ-পরবর্তী পুনরুদ্ধার যত দ্রুত হবে, উৎপাদন ও বাজারে নেতিবাচক প্রভাবও তত কম থাকবে।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও কৃষি অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক এমএ সাত্তার মন্ডল বলেন, ‘অনেক কৃষক শুধু নিজের জমিতে চাষের জন্য নয়, বিক্রির উদ্দেশ্যেও ধান ও বিভিন্ন সবজির বীজতলা তৈরি করেন। ফলে বীজতলা নষ্ট হলে তারা সরাসরি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বেন। তবে ক্ষতির মাত্রা নির্ভর করবে বন্যার পানি কতদিন স্থায়ী হয় তার ওপর। আবহাওয়া দ্রুত অনুকূলে ফিরলে অবশ্য সামগ্রিক ক্ষতি তুলনামূলক কম হবে।’

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত রোববার পর্যন্ত দেশের ২৯টি জেলার ১ লাখ ৪ হাজার ৯৩৬ হেক্টর ফসলি জমি আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আউশ ধান। আক্রান্ত জমির পরিমাণ ৭৬ হাজার ৬০ হেক্টর, যা মাঠে থাকা মোট আউশের ১৫ দশমিক ৫৯ শতাংশ। এবার মোট আউশ ধান চাষ করা হয়েছে ৪ লাখ ৮৭ হাজার ৯০৪ হেক্টর জমিতে।

এছাড়া ১৫ হাজার ৩২৫ হেক্টর গ্রীষ্মকালীন সবজিখেত এবং ৯ হাজার ৬১৯ হেক্টর আমনের বীজতলা বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে। কৃষি বিভাগের হিসাবে, আক্রান্ত বীজতলার চারা দিয়ে প্রায় ১ লাখ ৯২ হাজার হেক্টর জমিতে আমন চাষ করা সম্ভব। ধান, বীজতলা ও গ্রীষ্মকালীন সবজি ছাড়াও আরো ৩ হাজার ৯৩২ হেক্টর জমির বিভিন্ন ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবারের প্লাবনে।

ধান গবেষকদের মতে, আউশের যে পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে তা ধানের সামগ্রিক উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ভবিষ্যতে এ ধরনের ক্ষতি কমাতে জলবায়ু সহনশীল ও স্বল্পমেয়াদি ধানের জাতের চাষ বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) মূখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. হুমায়ুন কবীর বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমন ধানের বীজতলা পানি কমলে আবার তৈরি করা যাবে কিন্তু ডুবে যাওয়া আউশের ক্ষতি পোষানো সম্ভব না। তবে এ ক্ষতিটা নির্ভর করবে ধান কোন স্টেজে আছে তার ওপর। যদি মিল্ক স্টেজে থাকে তাহলে ক্ষতিটা সবচেয়ে বেশি হবে। তখন পানি কমে গেলেও দানা হবে না, আর বেশি পানি থাকলে পচে যাবে। অপরিপক্ব বা দানা অবস্থায় বেশি দিন পানির নিচে থাকলে সেটিও পচে যাবে। দ্রুত পানি নামলে এ স্টেজে ক্ষতিটা অবশ্য কম হবে।’

কৃষককে বন্যাসহনশীল জাত ব্যবহারের পরামর্শ দিয়ে এ কৃষিবিদ বলেন, ‘ব্রি-১১০ জাতটি বন্যাসহনশীল। এ জাতের ধান ১৫-২০ দিন পানির নিচে থাকলেও ফলন দেয়। সেজন্য যেসব এলাকায় বন্যা ও আকস্মিক ঢলের ঝুঁকি রয়েছে সেখানে জাতটি চাষ করতে আমরা কৃষককে পরামর্শ দিচ্ছি। দেশের স্বার্থে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরকেও এ জাতের ব্যাপক প্রচার চালাতে ব্রি থেকে জানানো হয়েছে।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে মৌসুমি বন্যা নতুন কোনো ঘটনা নয়। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় অতিবৃষ্টি, আকস্মিক পাহাড়ি ঢল এবং দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার ঘটনা বেড়েছে। এতে কৃষি উৎপাদনের ঝুঁকিও বাড়ছে। প্রতি বছরই বন্যা ও অতিবৃষ্টিতে ফসলের উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হচ্ছে, যার প্রভাব শুধু মাঠেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; পরবর্তী কয়েক মাস পর্যন্ত খাদ্য উৎপাদন, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং বাজারেও দেখা যাচ্ছে এর প্রতিফলন। তাই বন্যাকে কেবল একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, কৃষি পরিকল্পনার স্থায়ী বাস্তবতা হিসেবে বিবেচনা করার পরামর্শ দিচ্ছেন তারা। এজন্য আগাম সতর্কবার্তা জোরদার করা, জলবায়ু-সহনশীল জাতের সম্প্রসারণ, দ্রুত পুনর্বাসন এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহজ শর্তে আর্থিক সহায়তা নিশ্চিতের মতো দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নেয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বন্যা ও অতিবৃষ্টির কারণে কৃষি উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, তাই ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসনে সরকারের আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন। পরিস্থিতি আরো খারাপ হওয়ার আগেই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে হবে। আবার উৎপাদনে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিলে চাল ও গম আমদানির প্রয়োজন হতে পারে। সে সম্ভাবনাও মাথায় রেখে আগাম পরিকল্পনা থাকা উচিত।’

তিনি আরো বলেন, ‘সবজি চাষও সাম্প্রতিক বন্যা ও অতিবৃষ্টির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যার প্রভাব বাজারে পড়বে। তবে বর্তমান পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হলে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা কম। কিন্তু বৃষ্টি ও বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে উৎপাদন ও বাজার—উভয় ক্ষেত্রেই চাপ বাড়বে।’

বীজতলা নষ্ট হলে নতুন করে চারা তৈরি করতে হবে। এতে আমনসহ অন্যান্য ফসলের আবাদ বিলম্ব হবে। তবে এরই মধ্যে অনেক কৃষক পলি নেট হাউজে বা পলিথিন-সুরক্ষিত পরিবেশে বীজতলা তৈরি শুরু করেছেন। এ নিয়ে মাঠপর্যায়ে কৃষকদের সঙ্গে সরাসরি কাজ করছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।

সংস্থাটির সরেজমিন উইংয়ের পরিচালক মো. ওবায়দুর রহমান মণ্ডল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কোনো ফসল আক্রান্ত হলেই সেটি সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে—এমনটি ধরে নেয়া ঠিক হবে না। ক্ষতির প্রকৃত মাত্রা নির্ভর করবে জমিতে পানি কতদিন স্থায়ী থাকে তার ওপর। তাই আক্রান্ত ফসলের চূড়ান্ত ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে কিছুটা সময় লাগবে। তবে ক্ষতি কমিয়ে আনতে মাঠ প্রশাসন কৃষকদের সঙ্গে কাজ করছে।’

আরও